ফরিদপুর-৩ : ভোট যুদ্ধে আ.লীগের একক, বিএনপির একাধিক প্রত্যাশী

আব্দুল্লাহ আল-ফাত্তাহ, ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ফরিদপুর।
ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রভাবশালী জেলা ফরিদপুর। জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরিদপুর সদরের তিন নম্বর সংসদীয় আসন। এ আসনের সাংসদরাও নির্বাচিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদে। ফরিদপুর সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে ফরিদপুর-৩ আসন। ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১শ' ৬৮ জন ভোটারের ফরিদপুর-৩ আসনটিতে নারী ভোটার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩শ ১৫ জন।

ফরিদপুর সদর আসনের নির্বাচন এবার অতীতের যে কোনো বারের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এরই মধ্যে ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করতে সম্প্রতি পৌর এলাকার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বৃহত্তর ফরিদপুরের জেলাগুলো নিয়ে পদ্মা নামে বিভাগ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যার সদর দপ্তর হবে ফরিদপুর সদরে।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুরে বইছে ভোটের আমেজ। বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে চলছে গণসংযোগ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ছাড়া দলটির অন্য কাউকে মাঠে দেখা না গেলেও প্রতিপক্ষ বিএনপির একাধিক নেতা নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি এ আসনের সব ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও নৌকা ও ধানের শীষের ব্যাপক গণসংযোগ হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা হয়েছে।

উলেক্ষ্য ৯০-এ স্বৈরাচার পতনের পর থেকে ওয়ান ইলেভেন পর্যন্ত সময়ে ফরিদপুর সদরের এমপি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে পরাজিত করেন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

ফরিদপুর-৩ আসনে (সদর) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনঃনির্বাচিত হন বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আসন ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ যেমন নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়, তেমনি আসনটিতে ৫ বারের বিজয়ী বিএনপি মরিয়া পুনরুদ্ধারে। যদিও জেলা বিএনপির রাজনীতিতে রয়েছে দলীয় কোন্দল ও কাদা ছোড়া-ছুড়ির ঘটনা।

বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ বয়সের ভারে এলাকায় তেমন সক্রিয় না হলেও অনুসারীরা তার পক্ষে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আসনটিতে বিএনপির হেভিওয়েট এই প্রার্থীর পাশাপাশি একাধিক তরুণ সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এখন পর্যন্ত বর্তমান এমপি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামই আলোচনায় রয়েছে। তিনি এই আসনের পর পর দুবারের এমপি।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ছাড়াও রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা, কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা মাহাবুবুল হাসান ভুঁইয়া পিংকু ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল।

আসনটিতে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনও নিয়মিত যাওয়া আসা করছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গিয়ে তুলে ধরছেন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। উন্নয়নের ধারাবাহিকতার স্বার্থে আবারো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিশ্চিতে সমর্থন চাইছেন তিনি।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনোনয়ন ও বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়ে বলেন, "শুধু কথার ফুলঝুরি দিয়ে ভোট পাওয়া যায় না। জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করতে হয়। আমি এবং আমার দল ফরিদপুরে সেটা করে দেখিয়েছি। তিনি বলেন, জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। বিএনপি তাদের আর বোকা বানাতে পারবে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরে যে উন্নয়ন ফরিদপুরে হয়নি, গত দুই মেয়াদে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে।"

এদিকে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ বলেন, "দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং ভোটকেন্দ্রে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকলে ফরিদপুর সদর আসনটি বিএনপি আবার ফিরে পাবে বলে আশাবাদী সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দলে নেতৃত্ব বিকাশের ধারায় একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন চাইতে পারেন, এটাই স্বাভাবিক। নিজের মনোনয়নের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচন ছেলেখেলা নয়, জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এটি। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দুঃশাসনের জবাব দিতে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে দল। এজন্য অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত প্রার্থীরাই লড়বে।"

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা এরই মধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন। তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে। সম্প্রতি দেশব্যাপী বিএনপির বিভিন্ন কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচিও জোরাল ভাবে পালন করছেন।

সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা বলেন, "জীবনের দীর্ঘ সময় দলের জন্য ব্যয় করেছেন। আমার নেত্রী খালেদা জিয়া রাজপ্রাসাদ নয় রাজপথের নেতাকে পছন্দ করেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে এ পর্যন্ত আমি রাজপথে থেকে দলের সকল কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছি। শুধু তাই নয় ফরিদপুরের মানুষও আমাকে চায়। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে আমি সব সময় প্রস্তুত।"

এদিকে এ আসনটিতে যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মাহাবুবুল হাসান ভুঁইয়া পিংকু বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন জোড়েসোড়ে। শুরু থেকেই যুবদলের রাজনীতিতে জড়িত পিংকু ভুঁইয়া ৮০-এর দশকের আন্দোলন-সংগ্রামসহ শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারন করে বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ডে এখনো সক্রিয়। এলাকায় চাওর আছে ১৯৯৫ সালে স্থানীয় যুবলীগ সন্ত্রাসী দের হাতে তার আপন ছোট ভাই খুন হওয়ায় তার প্রতি জনগনের আলাদা সহমর্মিতাও বিদ্যমান। তিনি বিএনপির মনোনয়নে গত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেন।

পিংকু ভুঁইয়া বলেন, "আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হতেই কাজ করছি। এলাকায় নিয়মিত তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সাথে মত বিনিময় করছি। বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করছি। তার দাবি গত উপজেলা নির্বাচন ফেয়ার হলে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন।"

এ ছাড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন জুয়েলও মনোনয়ন পেতে সক্রিয়। তিনি দলীয় সমস্ত কর্মসূচিতে রাজপথে সক্রিয় থাকায় মামলা-হামলা এমনকি জেলে থাকতে হয়েছে বেশ কয়েক বার। নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন তিনি। সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের তরুণ নেতাকর্মীদের মাঝে তার ব্যাপক সমর্থক রয়েছে।

এ আসনে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর ভোট থাকলেও এখন পর্যন্ত দল দুটির কাউকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। তবে সিপিবির রফিকুজ্জামান এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

তবে ফরিদপুরের সুধীজনেরা মনে করেন ফরিদপুর সদর আসন সব সময়ই শান্তিপ্রিয় আসন। এখানে বড় ধরনের কোন রাজনৈতিক হানাহানি নাই। এখানে উন্নয়ন ও শান্তির ধারা যিনি অব্যাহত রাখতে পারবেন ফরিদপুর-৩ আসনের জনগণ তাকেই বিজয়ী করবে।

প্রতিষ্ঠাতা : মরহুম সাংবাদিক আরিফ ইসলাম।
প্রকাশক: ওয়াহিদ সোহেল।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : ইবনে সৈয়দ পিন্টু।
নির্বাহী সম্পাদক : রাজিব খান। বার্তা সম্পাদক : রুমন রহমান
যোগাযোগ : ১০৭/১, কাকরাইল, ঢাকা-১২১৭।
ইমেইল : AmarFaridpur@gmail.com